বাংলারিভিউ

Nayan Rahashya – A Film Review

Seven crystal balls – যারা টিনটিন কমিক্সের ফ্যান তাদের কাছে রেমী হার্জের টিনটিনের এই বইটি বেশ পরিচিত। গল্পের শুরু হয়েছিলো একটি স্টেজ শো থেকে। যেখানে অলৌকিক শক্তির অধিকারী এক ভারতীয় মহিলা তার অতীন্দ্রিয় শক্তির দ্বারা দর্শক আসনে উপস্থিত কিছু ব্যক্তিদের এমন কিছু তথ্য প্রকাশ করছিলেন যেটা বাস্তবিকই তার পক্ষে জানা অসম্ভব ছিল।

১০৯১ তে যখন সত্যজিৎ রায়ের নয়ন রহস্য বইটি প্রকাশিত হয়, গল্পটি পরে মনে হয়েছিল অতীন্দ্রিয় শক্তিধর নয়ন ওরফে জ্যোতিষ্কর স্টেজ শোর সিনটার সাথে টিনটিনের কমিক্সের উক্ত ঘটনার কিছুটা মিল আছে।

প্রায় কয়েক দশক পরে সন্দীপ রায়ের পরিচালনায় “নয়ন রহস্য” সিনেমায় তারক নাথ ঠাকুর (TNT) চরিত্রটি দেখে মনে হলো দর্শনে আচরণে ইনি যেন অনেকটাই “ক্যাপ্টেন হ্যাডকের” ছায়া। হয়তো নেহাতই কাকতালীয়, আমি নিজে টিনটিন ফ্যান বলেই এরকম মনে হচ্ছে, তবে একটা কথা বলতেই হবে সন্দীপ রায়ের পরিচালনায় ফেলুদা সিরিজের মধ্যে “নয়ন রহস্য” অন্যতম সেরা সিনেমা।

গল্প হিসাবে নয়ন রহস্য, আর পাঁচটা ফেলুদা গল্পের মতন সেভাবে আকর্ষণ করেনি। তার প্রধান কারণ ডিটেকটিভ গল্পের বাস্তবতা থেকে সরে এসে গল্পটি কিছুটা অতীন্দ্রিয়তায় ঘেঁষা মনে হয়েছিল। গল্পটিও খুব একটা জোরালো ছিলো না। সেই সময় জীবনের প্রায় শেষপ্রান্তে সত্যজিৎ রায়ের অসুস্থতার কারনে হয়ত গল্প বিন্যাসে প্রভাবিত করেছিল

২০২৪ শে এই গল্পেরই সিনেমা রূপ কিন্তু বেশ জমিয়ে দিয়েছে। অথচ ফেলুদার গল্প হিসাবে এই সিনেমাটি অনেক বেশি কঠিন ছিল। ফেলুদার গল্প মানেই অনেক ভ্রমন, এ্যাকশান এবং প্রচুর আউটডোর লোকেশনে শুটিং। সে তুলনায় “নয়ন রহস্য” সিনেমাটিতে ডায়ালগ আর ইন্ডোর শটের আধিক্য । ট্রেডমার্ক ফেলুদার গল্পের থেকে অনেকটাই ভিন্ন। ফলে এই গল্পকে সিনেমায় পরিবর্ত করা অনেকটাই চ্যালেঞ্জিং ছিল। সন্দীপ রায় এই কঠিন কাজটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সামলেছেন।

ফেলুদার সিনেমার একটি বিরাট অংশের দর্শক কম বয়সী । প্রায় অ্যাকশান হীন ফেলুদার সিনেমায় জুনিয়র দর্শকদের শেষ পর্যন্ত আসনে বসিয়ে রাখতে পেরেছেন সন্দীপ রায়।

এবার গল্প আসা যাক। ফেলুদার গল্পের বিশেষত্ব হলো গল্প সেরকম বলার প্রয়োজন হয় না। বাঙালির প্রতিটি প্রজন্ম ফেলুদার গল্প পড়ে বেড়ে ওঠে। আমাদের মতন বয়সীদের তো বেশ কয়েকবার ফেলুদার বইগুলি পড়া হয়ে যায়।

যাইহোক ঘটনায় আসা যাক। শুরুতে যে টিনটিন কমিক্সের স্টেজ শো বলেছিলাম অনেকটা সেই ভাবেই – ম্যাজিশিয়ান সুনীলের তরফদারের ম্যাজিক শো দিয়ে সিনেমা শুরু। ম্যাজিক শো শেষ হয় ছোট্ট বালক নয়ন ওরফে জ্যোতিষ্কের সংখ্যার উপর আশ্চর্য ক্ষমতার প্রদর্শন দিয়ে।

প্রত্যাশিত ভাবেই নয়নকে হস্তগত করে কিছু সুবিধা কিম্বা শর্ট কার্ট রোজগারের ধান্দার উদ্দেশে জুটে যায় কিছু বিত্তশালী এবং একজন আজব ব্যক্তি, যিনি দৈত্যকায় খুনে প্রবৃত্তির উগান্ডার মানুষ “গাওয়াঙ্গির” মালিক তারক নাথ ঠাকুর ওরফে TNT।

বিস্ময় বালক নয়নকে সুরক্ষিত রাখার কাজে লেগে পরে ফেলুদা এন্ড কোম্পানিও।

এরই মধ্যে এক অনামী রহস্যময় পৃষ্টপোষকের আনুকূল্যে ম্যাজিক শোর উদ্যেশ্য চেন্নাই হাজির হয় নয়ন সহ ম্যাজিশিয়ান সুনীল তরফদার, সাথে নয়নের সিকিউরিটির দায়িত্বে থাকা ফেলুদা এন্ড টিম। একই সাথে নয়নকে অপহরণ করার উদ্দেশ্যে সাথে হাজির হয় “দুষ্ট” লোকের দল।

এখানে উল্লেখ্য যে ফেলুদা যেন কিছুটা নিস্প্রভ, নয়নকে দেখা শোনার দায়িত্ব তোপসেকে আর সকলের সাথে কথা বলার দায়িত্ব অনেকটাই লালমোহন বাবুকে দিয়ে দিয়েছে। ফেলুদা নিজে একটু রিল্যাক্সড থাকতে চাইছে, ঘুরে বেরাচ্ছে। ফলে ফেলুদার সাথে দর্শকদের অল্প বিস্তর মহাবলিপুরমের কিছু প্রাচীন ভারতীয় কীর্তি দর্শন হয়ে গেলো। এইতটুকুই বলতে গেলে আউটডোর, একই সাথে দৈতিকায় গাওয়াঙ্গি দর্শনও হয়ে গেলো হাল্কা এক সংঘর্ষের মধ্যে দিয়ে।

শুরুতেই যে আশঙ্কা ছিল শেষমেশ সেটাই সত্যি হলো। বিস্ময় বালক নয়ন অপহৃত হলো। এতক্ষণে ফেলুদা যেন কিছুটা জেগে উঠল। ফলে আচমকা ঘটনার ঘনঘটায় দ্রুত ক্লাইম্যাক্স । বরং আন্টি ক্লাইম্যাক্স বললেই ভালো। যে মানুষটার প্রতি দর্শকদের একটা ভাললাগা বোধ তৈরী হয়ে গেছিল তাকেই খুনি মানতে মন চায়নি। এখানে মনে হয়েছে মূল গল্প থেকে একটু সরে এসে ক্লাইম্যাক্সটা কিছুটা অন্যরকম করতে পারলে মনে হয় ভালো হতো।

গত শতাব্দীর নব্বই দশকের গোড়ার দিকে সিসিটিভির ব্যবহার সেরকম একটা ছিল না। নয়ন রহস্য সিনেমাটির সময়কাল কিন্তু ২০১৪ সাল বলা হয়েছে। যে সময় যে কোনো নামী হোটেলে করিডোরে প্রচুর সিসিটিভি ক্যামেরা থাকার কথা। ফলে ক্যামেরার চোখ এড়িয়ে অন্য করো হোটেল রুমে প্রবেশ করে খুন করাটা বেশ অবাস্তব। তবুও সন্দীপ রায়ের সিনেমাতে রায় ঘরানার একটা স্মার্টনেস থাকে যেটা আমাদের সিনেমা শেষ পর্যন্ত বসিয়ে রাখে অনায়াসে।

কি হলো শেষে ? নয়নকে কি উদ্ধার করা গেলো? চেন্নাইতে ম্যাজিক শো কি শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হতে পারলো? ফেলুদার মগজাস্ত্র কি এই একবিংশ শতাব্দীতেও প্রাসঙ্গিক ? জানতে হলে টিকিট কেটে অবশ্যই দেখে ফেলুন সন্দীপ রায়ের নির্দেশনায় জমজমাট ফেলুদার সিনেমা “ নয়ন রহস্য”।

গত রবিবার আনোয়ার শাহ রোডে নবিনা হলে সিনেমার শেষে একটা চমক ছিল। সিট ছেড়ে সকলে উঠে আসবো এমনি সময় মাইকে ভরাট কন্ঠস্বর কানে এলো “নমস্কার আমি সন্দীপ রায়, সিনেমা কেমন লাগলো বলুন।”

পরিচালক স্বয়ং হাজির? আমরা ব্যালকনি থেকে নিচে তাকিয়ে দেখি সন্দীপ রায় এবং লালমোহল বাবু উপস্থিত। দর্শকের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইছেন। দর্শকরা অভিভূত! অনেকেই জানতে চাইলেন শুধু লালমোহন বাবু কেনো? ফেলুদা কই ? তোপসে কই? আন্দাজ করা গেলো “হত্যপুরীর” দ্বিধা কাটিয়ে বর্তমান প্রজন্মের দর্শক, ফেলুদা তোপসে আর লালমোহন হিসাবে ইদ্রলীন, আয়ুষ এবং অভিজিৎ গুহকে, মেনে নিতে পেরেছেন। সন্দীপ রায় স্বচ্ছন্দ্যে এই ত্রয়ী নিয়ে আরো কয়েকটি ফেলুদার সিনেমা বানাতে পারেন।

Sudip Chakraborty

© Copyright Lifeplus Art Magazine. Content cannot be copied and published elsewhere. Content link can be shared with permission. call/WhatsApp: 094777 64615

For an honest review of your film/short film in our magazine, call/WhatsApp: 094777 64615

Developed By SanccyWebs