বাংলারিভিউ

My Name is Imran” — এক মানবিক দলিল

 অন্তর্জগতের টানাপোড়েনের সবটুকু কি বাইরে থেকে বোঝা যায়?একটি মুখ, টুকরো শব্দবন্ধ, আচরণের কিছু অসামঞ্জস্য, অকারণ উচ্ছ্বাস, হঠাৎ ডুবে যাওয়া—এসব দেখেই আমরা খুব দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাই। বলি, “ওর একটু সমস্যা আছে।”

কিন্তু এই ‘ঠিক’ না থাকারও তো একটি ইতিহাস আছে—দীর্ঘ, অনুচ্চারিত, প্রায়শই একাকী। “My Name is Imran” সেই ইতিহাসের এক সংযত, মানবিক উপস্থাপন। এটি কেবল একটি ডকুমেন্টারি নয়; বরং মানুষের মন, তার দোদুল্যমান ভারসাম্য, এবং তা রক্ষা করার অদৃশ্য শ্রমকে দৃশ্যমান করে তোলার প্রয়াস।

   এখানে ইমরান একক ব্যক্তি, আবার একইসঙ্গে একটি রূপক—আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা সেইসব মানুষের, যাদের যন্ত্রণা আমরা “স্বভাব”, “সমস্যা”, “পাগলামি”, বা “অতিরঞ্জন” বলে ভুল করি।

অভিষেক গাঙ্গুলীর এই ডকুমেন্টারিতে বাইপোলার ডিসঅর্ডার কোনো ‘বিষয়’ নয়, বরং একজন মানুষের জীবনযাপনের অন্তর্গত বাস্তবতা।

    ডকুমেন্টারিতে ইমরানের ওঠানামা, ছন্দপতন, অস্থিরতা ও সংবেদনশীলতা উঠে এসেছে এমন ভাবে যাতে দর্শক একজন পূর্ণ মানুষকে দেখে , যাকে সমাজ বারবার অসম্পূর্ণ করে পড়তে চেয়েছে।

এই ছবির ভাষা সংযত, অতিরঞ্জনহীন, অযথা আবেগবর্জিত। পরিচালক যেন খুব সচেতনভাবেই চেয়েছেন, বিষয়টিকে ‘দেখানোর’ চেয়ে ‘শুনতে’।

   এই শুনতে পারার নৈতিকতা গুরুত্বপূর্ণ—কারণ মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে তৈরি বহু কাজই আক্রান্ত মানুষটিকে দর্শনীয় করে তোলে, তার যন্ত্রণাকে ‘কনটেন্ট’-এ নামিয়ে আনে।কিন্তু এখানে ইমরানকে ‘এক্সপোজ’ করা হয় না; বরং তার অস্তিত্বের চারপাশে একটি সম্মানজনক দূরত্ব বজায় থাকে।

দৃশ্য, নীরবতা, বিরতি, অসম্পূর্ণ বাক্য—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক ধরনের মানসিক ভৌগোলিকতা, যেখানে ‘ঘটনা’ কম, কিন্তু অভিজ্ঞতা গভীর।

    ডকুমেন্টরির গভীরতম এক অনুরণন বোধহয় অন্যত্র।ইমরানের মা, শ্রীমতি রত্না চৌধুরী,- এই ছবির এক মর্মস্পর্শী উপস্থিতি। আমাদের সমাজে ‘care’ বা পরিচর্যার ভাষা সীমিত । বিশেষত মানসিক অসুস্থতার ক্ষেত্রে, যেখানে একজন মানুষকে শুধু চিকিৎসা নয়, বরং সাহচর্য, ধৈর্য ও মানসিক শক্তি দিয়ে ধরে রাখতে হয়।

ইমরানের মা কোনো নাটকীয় চরিত্র নন—বরং এক গভীর বাস্তবতা।তাঁর মধ্যে যেমন স্নেহ আছে, তেমনই আছে বহন করার অসামান্য ক্ষমতা। তাঁকে দেখতে দেখতে মনে হয়, বাইপোলার ডিসঅর্ডার কেবল একজন মানুষের অসুখ নয়—এটি একটি পরিবারের ভিতরে প্রবেশ করা দীর্ঘ আবহাওয়া, যা সময়ের ছন্দ, সম্পর্কের ভঙ্গি, এমনকি ভালোবাসার সংজ্ঞাকেও বদলে দেয়।অভিষেক গাঙ্গুলি এই অনুচ্চারিত ইতিহাসকেই দৃশ্যমান করেন —যেখানে পাশে থাকা মানুষটির ক্লান্তি, অসহায়তা, এবং প্রচেষ্টা —একত্রে ওতপ্রোত ভাবে ধরা দেয় দর্শকের চোখে |

    ইমরানের অভিজ্ঞতার সঙ্গে শায়েরী ও আত্মপ্রকাশের সম্পর্ক সুন্দর ভাবে চিত্রিত হয়েছে ছবিতে |ইমরান এক স্বভাবজাত শায়ের—জীবনের গোলকধাঁধার মধ্যেও যে তৎক্ষণাৎ শব্দ খুঁজে পায়।

এখানে ভাষা কেবল বয়ান নয়—বেঁচে থাকার উপায়।

মানসিক যন্ত্রণায় মানুষ প্রায়ই ভাষাহীন হয়ে পড়ে; আর যে কষ্টকে বোঝানো যায় না, তার ওজন বহন আরও কঠিন হয়ে ওঠে। সেই নীরবতা যদি শব্দে ধরা পড়ে—তবে সৃজন চিকিৎসা না হলেও, অস্তিত্বের সহচর হয়ে ওঠে। ইমরানের শায়েরী সেই সেতুই তৈরি করে—অন্ধকার থেকে ফিরে আসার এক অন্তর্লিখন।

   এই শায়েরীগুলির লিপিবদ্ধ রূপ গড়ে উঠেছে নৃত্য শিল্পী ও সমাজসেবী রুমেলা মুখার্জীর সৃজনশীলতা, উৎসাহ ও সহমর্মিতায়। তিনি কেবল এই ডকুমেন্টরির আয়োজক নন; ইমরানের সৃষ্টিশীল সত্তার প্রকাশের ক্ষেত্র গড়ে তোলায় তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই ছবির বহু সৃজনশীল মুহূর্ত তাঁর স্পর্শে পূর্ণতা পেয়েছে |

    এই ডকুমেন্টারিটি নিয়ে আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট—এটি কেবল ‘ভালো ছবি’ হিসেবে নয়, বরং একটি প্রয়োজনীয় কাজ হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে।অভিষেক গাঙ্গুলীর এই কাজ তাঁর সেই স্বভাবসিদ্ধ প্রবণতারই অংশ, যেখানে তিনি “least visited turfs” বা কম-আলোচিত, জটিল এবং সামাজিকভাবে এড়িয়ে যাওয়া বিষয়গুলিকে চলচ্চিত্রের কেন্দ্রে আনেন | এ ধরনের কাজ যখন ইউটিউবের মাধ্যমে দর্শকের কাছে পৌঁছয়, তখন প্রতিক্রিয়াগুলি অনেক সময় ‘রিভিউ’ হয়ে থাকে না—বরং হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তি।এইভাবেই একটি ডকুমেন্টারি শিল্পের সীমানা ছাড়িয়ে সামাজিক আলাপের ক্ষেত্র তৈরি করে।

    আমরা এখন এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন ‘mental health’ শব্দবন্ধটি বহুল উচ্চারিত—

তবু তার ভিতরে প্রায়ই এক ধরনের superficiality থেকে যায়। ছবিটি মনে করিয়ে দেয়—মানসিক স্বাস্থ্য কোনো স্লোগান নয়; এটি মানুষের জীবন, সম্পর্ক, পারিবারিক ইতিহাস, সামাজিক দৃষ্টি, এবং দীর্ঘ নীরবতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি বাস্তবতা।

    শেষ পর্যন্ত, “My Name is Imran” ব্যক্তির গল্প বললেও, তা আমাদের সমাজের প্রতিচ্ছবিই তুলে ধরে।আমরা কাকে ‘স্বাভাবিক’ বলি, কাকে ‘সমস্যা’ বলি, কাকে আড়াল করি, কাকে বহন করি—এইসব প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায় আমাদের।আর সেই কারণেই, এই ডকুমেন্টারি শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়—এটি মানুষকে নতুন করে দেখার একটি অনুশীলন।

-A Review by Sudeshna Sanyal
পরিচালনা: অভিষেক গাঙ্গুলী
(Cinema for a cause)
বিশেষ কৃতজ্ঞতা :
রত্না চৌধুরী
রুমেলা মুখার্জী

সুদেষ্ণা সান্যালের কাছে লেখালেখি মানে চিন্তার ভাষা। পেশায় তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, কিন্তু তাঁর আসল অনুরাগ শিক্ষা—যা নিয়ে তিনি নিরন্তর ভাবেন ও অনুসন্ধান করেন। শ্রেণিকক্ষের ভেতর-বাইরের শেখার নানা দিক, শিশুদের কল্পনাময় জগৎ আর সমাজের অদেখা গল্প তাঁকে অনুপ্রাণিত করে শব্দে নিজেকে প্রকাশ করতে।

কবিতা লেখা থেকে আঁকাআঁকি—সবকিছুতেই তিনি খুঁজে পান নিজের পরিচয় গড়ে তোলার পথ। পড়াশোনা তাঁর প্রতিদিনের সঙ্গী, আর লেখালেখি তাঁকে নিয়ে যায় প্রাসঙ্গিক ও অপ্রাসঙ্গিকের মাঝের সীমারেখায়। শিল্পসম্মত জীবনবোধকে তিনি মনে করেন বেঁচে থাকার ও বিকশিত হওয়ার উপায়, আর সেই জীবন তিনি পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চান তাঁর লেখার মাধ্যমে।

Read this review in English

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Developed By SanccyWebs