Latestবাংলাশিল্প - সংস্কৃতি

চার্বাকের চোখে শিবরাত্রি” ইতিহাসের বিবর্তন, লোকায়ত ভাবনা, বেদ ও মঙ্গলকাব্যের আলোকে – সুদেষ্ণা সান্যাল

যা দেখা যায় না, যা ছোঁয়া যায় না—
তার জন্য যা দেখা যায় ও ছোঁয়া যায়, তাকে নষ্ট করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।”
— চার্বাক (ভাবানুবাদ)

শিবরাত্রি—একটি রাত, উপবাস, আর  জাগরণ। অথচ এই একরাতের ভেতর জমে আছে বহু শতাব্দীর ভয়, বিশ্বাস, যৌন চেতনা ও সামাজিক অভ্যাস। শিবরাত্রিকে কেবল ধর্মীয় আচার হিসেবে দেখলে তার মানবিক ইতিহাস অধরাই থেকে যায়। এই উৎসবকে বুঝতে চাইলে  দরকার সংশয়ী দৃষ্টি—যে দৃষ্টি দেবতার চেয়ে মানুষকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

চার্বাক ঈশ্বর মানেন না, কিন্তু মানুষের আচরণ গভীর মনোযোগে লক্ষ করেন। তাই তাঁর চোখে শিবরাত্রি কোনও স্বর্গীয় সত্য নয়—এটি সমাজের এক দর্পণ, যেখানে বিশ্বাসের পাশাপাশি ভানও প্রতিফলিত হয়।

এই ইতিহাস দেবতা দিয়ে শুরু হয় না। আদিম শিব অনার্য, গ্রামীণ, প্রকৃতিনির্ভর। পশুপতি—পশু, বন, উর্বরতা ও শরীরের শক্তির প্রতীক। এই শিব ধ্বংসকে ভয় পান না, কারণ প্রকৃতির কাছে ধ্বংস মানেই পুনর্গঠন। এখানে শিব অলৌকিক নন; তিনি জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ।

চার্বাক এই শিবকে সন্দেহ করতেন না। কারণ এই শিব শরীরকে অস্বীকার করেন না। লোকায়ত ভাবনায় ইহলোকই একমাত্র সত্য, শরীরই অভিজ্ঞতার কেন্দ্র। চার্বাকী শ্লেষ এখানে স্পষ্ট—যে দেবতা শরীর ছাড়া সত্য শেখায়, সে দেবতা মানুষকে বাস্তব ভুলিয়ে দেয়।

বেদে শিবের সরাসরি উপস্থিতি নেই; সেখানে তিনি রুদ্র। রুদ্র ভয়ংকর, অনিয়ন্ত্রিত—আবার রোগনাশকও। এই দ্বৈততা আসলে মানুষের প্রকৃতিভয়ের প্রতিফলন। পরবর্তী বৈদিক স্তরে এই ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়েই রুদ্র ধীরে ধীরে আর্য ও অনার্য ভাবধারার মিশ্রণে “শিব”— তথা কল্যাণময় দেবতায় রূপান্তরিত হন।

চার্বাক এই রূপান্তরকে আধ্যাত্মিক উত্তরণ বলেন না। তাঁর শ্লেষ নির্মম—ভয় আগে দেবতার জন্ম দেয়, পরে তা  শালীনতায় আবৃত হয় । দেবতা বদলান, কারণ মানুষের প্রয়োজন পরিবর্তিত হয়!

লোকায়ত শিব শরীরের বিরুদ্ধে নন। ভোগ ও ত্যাগ এখানে একই জীবনের দুই প্রান্ত। কিন্তু বৈদিক ও পুরাণিক ধারায় শিব সংযম, উপবাস ও নিয়মের প্রতীকে পরিণত হন। শরীর তখন সন্দেহের বস্তু।

চার্বাক এখানে কটাক্ষ না করে পারেন না। যে শরীর দিয়ে মানুষ পূজা করে, সেই শরীরকেই কষ্ট দেওয়া—এ এক অদ্ভুত নৈতিকতা। শিবরাত্রির জাগরণ যদি আত্মপর্যালোচনা হয়, শরীরের সীমা বোঝার চেষ্টা হয়—তবে তার মানে আছে। না হলে তা চার্বাকের চোখে কেবল অনুশীলিত কষ্ট।

বাংলার মঙ্গলকাব্যে শিব আবার মাটিতে নেমে আসেন। তিনি দরিদ্র, সংসারী, প্রায় অসহায়। গাজন ও চড়কের শিব ক্ষুধার্ত, দাম্পত্য কলহে জর্জরিত। এই শিব অলৌকিক নন—তিনি মানুষের মতোই দুর্বল।

চার্বাক এই শিবকে গুরুত্ব দিতেন। কারণ এই শিবকে  প্রশ্ন বা দুঃখ ; জাগতিক ভাবনা দিয়ে স্পর্শ করা যায়  ।  সংকুচিত হয় দেবতা আর মানুষের দূরত্ব | চার্বাকী শ্লেষ এখানে নরম—যে দেবতা মানুষের কষ্ট বোঝে না, সে দেবতা শেখায় কীভাবে?

আধুনিক শিবরাত্রিতে আদিম লোকায়ত শিকড়, বৈদিক আচার ও মঙ্গলকাব্যের লোকজ উৎসব—সব একসঙ্গে উপস্থিত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাজার, গণমাধ্যম ও প্রদর্শনের সংস্কৃতি। এই বাজারি ধর্মচর্চা সমাজকে এক ধরনের নৈতিক স্বস্তি দেয়। আচার মানলেই দায় শেষ—এই ধারণা প্রশ্নকে স্থগিত রাখে। চার্বাকের ভাষায়, এটি ধর্ম নয়; এটি দায়  অস্বীকার করার সুবিধাবাদী প্রদর্শন | আজকের শিবরাত্রি আর নীরব জাগরণ নয়; এটি দৃশ্যমান সামাজিক পারফরম্যান্স। বাজার এই রাতকে ভেঙে ফেলেছে প্যাকেজে—উপবাসের মেনু, জাগরণের ইভেন্ট, ভক্তির ব্র্যান্ডিং। ভক্তি এখন অনুভব নয়, প্রদর্শন।

চার্বাকের বিদ্রুপ এখানে ধারালো—আগে পুণ্য মিলত কর্মে, এখন পুণ্য মেলে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে। সামাজিক দর্পণে দেখা যায়, শিবরাত্রি আত্মসংযমের চর্চা নয়, আত্মপ্রচারের সুযোগ। ইহলোকের বাস্তব দুঃখ—ক্ষুধা, বৈষম্য, শ্রমের অবমাননা—উৎসবের আলোয় চাপা পড়ে| জাগরণ অনেক সময় আত্মজিজ্ঞাসা নয়, ইভেন্টে পরিণত হয়।

চার্বাকের দৃষ্টিতে ইতিহাস তখনই জীবিত থাকে, যখন তা প্রশ্ন উসকে দেয়। চার্বাকের চোখে শিব কোনও চিরস্থায়ী দেবতা নন; তিনি মানুষের ইতিহাসেরই নির্মাণ। সমাজ বদলেছে বলেই শিবের রূপ বদলেছে। যে উৎসব প্রশ্ন কে জাগ্রত করে , তা জীবনের প্রতিফলন |আর যে উৎসব প্রশ্নকে ঘুম পাড়ায়—তা শুধু জাগরণের সফল অভিনয়।শিবরাত্রিও তাই কোনও স্থির ধর্মীয় সত্য নয়—এটি মানুষের সামাজিক ও মানসিক বিবর্তনের এক চলমান প্রতিলিপি |

এই লেখায় চার্বাক কোনও ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে উপস্থিত নন। তিনি এখানে একটি রূপক—একটি সংশয়ী দৃষ্টি, যা দেবতা নয়, মানুষকে প্রশ্ন করে। চার্বাক মানে এখানে বিশ্বাস ভাঙা নয়, বরং বিশ্বাসের সামাজিক ব্যবহারকে দেখা। শিবরাত্রিকে আমি এই প্রবন্ধে ধর্মীয় বিধান হিসেবে নয়, মানুষের আচরণ, শরীরবোধ ও সমকালীন সামাজিক প্রবণতার দর্পণ হিসেবে পড়তে চেয়েছি। লোকায়ত শিকড় থেকে বৈদিক সংযম, মঙ্গলকাব্যের ঘরোয়া শিব থেকে আধুনিক বাজারি উৎসব—এই দীর্ঘ যাত্রার ভেতর দিয়ে শিব আসলে বদলান, কারণ সমাজ বদলায়। চার্বাক সেই বদলের ভেতরে দাঁড়িয়ে একটাই প্রশ্ন করেন—
আমরা কি উৎসবের আড়ালে বাস্তবকে এড়িয়ে যাচ্ছি?
এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়াই এই লেখার একমাত্র উদ্দেশ্য।
সামাজিক সমস্যা ও প্রান্তিক অনুভূতির বিশ্লেষণ আমার দিন যাপনের অঙ্গ | আমি সুচেতনা ওরফে সুদেষ্ণা সান্যাল 
Mail – suchetana943@gmail.com
Mobile- 8334878094

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Developed By SanccyWebs