Creative ReviwesMoviesবাংলারিভিউ

ছোটকা – শর্ট ফ্লিম রিভিউ

ছোটকা একটি সাড়ে চোদ্দো মিনিটের শর্ট ফিল্ম। ফিল্মটি দেখে একটা যুতসই হেডলাইন চিন্তা করছিলাম। কি লেখা যায়? ‘নিরাশা থেকে আশার গল্প ‘? বা ‘থেমে না থাকার’ গল্প? কিম্বা ‘ওল্ড ইজ গোল্ড’? অথবা ‘সাদা কালো থেকে রঙিনের’ গল্প? আসলে যেকোনো একটাই হেডলাইন হতে পারে! কারণ সব কটাই যথার্থ ভাবে শর্ট ফ্লিমটির গল্পের ভাব নির্দেশ করে।গল্প শুরু হয় অপ্রত্যাশিত ভাবে সাদা কালোতে। ফলে প্রাথমিক ভাবে মনে হয়েছিলো এটি একটি ষাট- সত্তর দশক পটভূমিকার ফিল্ম। কারণ ২০২৩ সে নির্মিত ২০২৩ সের পটভূমিকার গল্প সাদাকালো কেনো হবে? এখানেই, চিত্রনাট্যকর, গল্পের অন্যতম অভিনেতা এবং নির্দেশক অভিষেক গাঙ্গুলীর মুন্সিয়ানা। সাদাকালোকে তিনি আশা – নিরাশার রূপক হিসাবে ব্যবহার করেছেন।

প্রখ্যাত ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার অভি কিছুটা নিমরাজি হয়েই তার স্ত্রী ফুলকির (অভিনয় কবি ফুল্লোরা মুখোপাধ্যায় ) ক্রমাগত ইন্ধনে একটি অপ্রীতিকর কাজ করতে চলছেন। তার নির্বিরোধী ৭১ বছরের ছোটকাকে নিজের মুখে বৃদ্ধাশ্রমে চলে যেতে বলতে চলেছেন। কারণ ছোটকার শহরের মধ্যস্থলে অবস্থিত অ্যাপার্টমেন্টটি যে মুখার্জী দম্পতির বড়ো দরকার। এরকম লোভনীয় ফ্ল্যাট একটি অকৃতদার বৃদ্ধর দখলে থাকা মানে জায়গাটার অপব্যবহার।

ছোটকা তাঁর প্রিয় ভাইপো আর কন্যাসম ভাইপো বউয়ের মুখে বৃদ্ধাশ্রমে চলে যাওয়ার প্রস্তাব পেয়ে ভীষণ ভাবে আশাহত হন। স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়েন। তাঁর পরিবারের অনেক ঘটনার সাক্ষী ওই ফ্ল্যাট। কিন্তু সেখানেই তিনি থেমে যাননি। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তিনি নতুন করে বাঁচবেন। বৃদ্ধাশ্রমে যাওয়া মানে সব শেষ নয়। একসময়ের বিখ্যাত বার্ড ফটোগ্রাফার ছোটকা তথা দধিচি মুখোপাধ্যায় তাঁর পুরনো পাখীর ফটো তোলার শখ নিয়ে বাঁচবেন। রবীন্দ্র সরোবরের কাছে বৃদ্ধাশ্রমে থেকেই আবার ফটোগ্রাফি চর্চা শুরু করবেন। ঠিক এখানে ফিল্মটির রঙিন রূপে প্রকাশ হলো।

আমরা দেখলাম বৃদ্ধাশ্রমে বাসরত ছোটকা মোটেও হতাশায় ভেঙে পড়েননি। বরং নতুন উদ্যমে তার বার্ড ফটোগ্রাফি চর্চা শুরু করেছেন রবীন্দ্র সরোবরের মাঝে। সেখানে পেয়ে গেছেন তাঁর কিছু পুরনো সঙ্গী এবং ফটোগ্রাফির অত্যুৎসাহী তরুণ তরুণী। ছোটকা তথা দধিচি মুখোপাধ্যায়ের বার্ড ফটোগ্রাফি সুশীল সমাজে সমাদৃত হয়। তাঁর ফটোর প্রদর্শনী উদ্বোধন করবেন স্বয়ং রাজ্যপাল, একথা খবরের কাগজে পড়ে জানতে পারে অভী ওর তার স্ত্রী ফুলকি।

ছোটকার এই অসাধারণ স্বীকৃতির কারণ ফুলকি কিছুতেই খুঁজে পায় না, কিন্তু অভী তার ছোটকর প্রতিভার কদর বোঝে, কারণ যে মানুষটার জন্য আজ অভি ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন সে হলেন অভির ছোটকা।

ছোটকা একটি ছোট্ট ফিল্ম কিন্তু তার ব্যাপ্তি অনেক। বঙ্গসমাজে বহু বয়স্ক ব্যক্তি সংসারে নিজের ঘনিষ্ট স্বজন দ্বারাই পরিত্যক্ত হয়ে চলেছেন। অবজ্ঞার স্বীকার হচ্ছেন । নিজের পরিবার থেকে বিতাড়িত হয়ে বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। ছোটকা শর্ট ফিল্ম সেই বিষয় দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়েছে আমাদের। তবে গল্প নিরাশায় শেষ হয়নি। বরং দৃরতার সাথে ছোটকার মাধ্যমে বলেছে – জীবন থেমে থাকে না। যে কোনো প্রতিকূলতা থেকে যে কোনো বয়সে ঘুরে দাঁড়ানো যায়।

মোবাইলে ক্যামেরা, ডিজিটাল ক্যামেরা সহজলভ্য, ফলে ফলে সমাজম্যাধমে মুড়ি মুরকির মতন শর্ট ফিল্ম প্রকাশ হচ্ছে। কিন্তু খুব কম ফ্লিমের গুনগত মান বজায় থাকে। অভিষেক গাঙ্গুলির নির্দেশনায় “Cinema for a Cause” এর প্রযোজনায় ফ্লিমগুলি কিন্তু তার ব্যাতিক্রম। সামাজিক বার্তা বহন করা সৃষ্টিশীল সিনেমা তৈরি করে এই প্রতিষ্ঠানটি। সদ্য প্রকাশিত “ছোটকা ” ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি দেশি বিদেশী চলচিত্র উৎসবে জায়গা করে নিয়েছে।

অরুণিমা গাঙ্গুলির মুল গল্প অবলম্বনে নির্মিত সাড়ে চোদ্দ মিনিটের সিনেমায় ছোটকার ভুমিকায় অনবদ্য অভিনয় করেছেন বিকাশ বসু। নির্দেশক অভিষেক গাঙ্গুলি স্বয়ং অভির ভুমিকায় এবং ফুল্লোরা মুখোপাধ্যায় তার স্ত্রির ভুমিকায় যোগ্যতার সাথে অভিনয় করেছেন। বার্ড ফটোগ্রাফারদের দলের সদস্য হিসাবে গৌতম ভট্টাচার্য, অভিক ভট্টাচার্য, শৌর্য গাঙ্গুলি এবং অনুপ্রিয়া ব্যানারজি মিস্র কোন সংলাপ ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গত দিয়েছেন। এখানে উল্লেখযোগ্য যে গৌতম ভট্টাচার্য বাস্তব জীবনে সত্যই একজন খ্যাতনামা বার্ড ফটোগ্রাফার।

ফটোগ্রাফিতে বাপি সামন্ত দুরন্ত কাজ করেছেন। ফ্লিম এডিট করেছেন সৌম্যজিত দে, এখানে বলার যে শব্দ গ্রহন কিছু জায়গায় ভলিউমের তারতম্য বোধ হয়েছে। এছাড়া ছোটকা একটি মনে রাখার মতন শর্ট ফ্লিম।

রিভিউ – সুদীপ চক্রবতি, www.lifeplusmagazine.com

Developed By SanccyWebs