Poetry & Writingবাংলাভ্রমন

কুমায়নের বর্ষা: মেঘ, পাহাড় আর স্মৃতির পথে 

জুলাই মাসের বর্ষা কুমায়নের পাহাড়গুলোকে সবুজের কোমল ছোঁয়ায় রাঙিয়ে তোলে। মেঘেরা পাইন বন আর ছোট ছোট গ্রামগুলোকে জড়িয়ে ধরে। এই সময়টায় পর্যটকদের ভিড় থাকে না, পাহাড় যেন নিজের নিঃশ্বাস ফেলতে পারে। আমাদের যাত্রা শুরু হয় রানিক্ষেত থেকে।

রানিক্ষেত যাওয়া ছিল হঠাৎ নেওয়া সিদ্ধান্ত। আমাদের গাড়িচালক দেবন সিংহ যেই রাস্তা ধরে নিয়ে গেলেন, যেখানে ভিজে পাইন গাছের গন্ধ ভাসছিল। প্রথমেই গেলাম গলফ কোর্সে—একটা শান্ত, সবুজ জায়গা, যেটা এখন সেনাবাহিনী দেখাশোনা করে। সেদিন কোনো খেলোয়াড় ছিল না, যদিও গলফ কোর্সের মাঠটা নিজের গাম্ভীর্য বজায় রেখেছিল। পুরনো ব্রিটিশ আমলের বাংলোগুলো যেন কোনো নাটকের সেটের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। আমরা কাদা মাখা জুতো আর পকেটভরা নাশপাতি নিয়ে রানিক্ষেত ছাড়লাম।

এরপর পৌঁছালাম কৌশনীতে। মেঘ তখন নিচে নেমে এসেছে। এখানে দু’দিন ছিলাম। প্রথমেই চোখে পড়ল বাগানের গঠন—ঝোপগুলো সারি করে সাজানো। ছোট ছোট পথ চলে গেছে চা-বাগানের মধ্য দিয়ে, কিছু জায়গা থেকে দূরের পাহাড় দেখা যায় (যদিও আমাদের ভাগ্যে হিমালয়ের চূড়া দেখা হয়নি)। নিচে ফলের বাগান। কৃষকরা বৃষ্টির বিরতিতে ফল তোলে, আর দোকানে কাগজে মোড়া ফল, জ্যামের বোতল, আর রোদে শুকনো ফল বিক্রি হয়। এখানকার মানুষ এখনো অল্প পরিমাণে হাতে তৈরি নাশপাতির জ্যাম, ফলের সিরাপ আর শুকনো ফল বানান।

দেবন সিংহ আমাদের নিয়ে গেলেন মুন্সিয়ারি—পৃথিবীর প্রান্তে। এখানেই দেখা যায় পাঁচটি শুভ্র শৃঙ্গ—পঞ্চচুলি। কথিত আছে, পাণ্ডবরা স্বর্গে যাওয়ার আগে এখানেই শেষবার রান্না করেছিলেন। এই পাঁচটি শৃঙ্গ (৬,৩৩৪ থেকে ৬,৯০৪ মিটার) একদিকে ধর্মীয় প্রতীক, অন্যদিকে পর্বতারোহীদের চ্যালেঞ্জ। সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ পৌঁছালাম মুন্সিয়ারিতে। রাত ন’টার দিকে, মেঘ সরতেই দেখা গেল পঞ্চচুলি—একটা হালকা আলোয় ঝলমলে পাঁচটি চূড়া, যেন হাতে ঝুলিয়ে রাখা পাঁচটি দীপ।

পরদিন ভোরে রওনা দিলাম চাকোরির পথে। রাস্তা যেন জলরঙে আঁকা ছবি। সবুজ পাহাড়, হঠাৎ দেখা জলপ্রপাত। চাকোরি ছোট শহর, মুন্সিয়ারির চেয়ে অনেক শান্ত। আমরা পৌঁছালাম বৃষ্টির মধ্যে। পরদিন সকালে আকাশ যেন পুরনো ছবি রঙিন হয়ে উঠল। পঞ্চচুলি এবার রঙের আতশবাজির মতো উদ্ভাসিত—সোনালি, কমলা, আর হালকা হলুদ আলোয়। বরফ যেন ভেতর থেকে জ্বলছে। আগের রাতের আবছা রূপ এবার স্পষ্ট হয়ে উঠল। আমরা চুপচাপ দেখছিলাম, শহর তখন ঘুম থেকে জেগে উঠছে। চাকোরি সবসময়ই নিরিবিলি থাকে।

মুন্সিয়ারি থেকে নৈনিতাল যাওয়ার পথে আমরা চটজলদি যাত্রা করিনি। চাকোরি আর বিনসর—দুটো জায়গায় থেমে পাহাড়ের ছন্দে চলেছি। ইকো বিনসর এক টুকরো বনভূমি, প্রায় ৪৫ বর্গ কিলোমিটার জায়গা। চাঁদ রাজারা আর পরে ব্রিটিশরা এখানে গ্রীষ্মকাল কাটাতেন। কিছু পুরনো বাংলো এখনো গাছের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। বিনসর থেকে হিমালয়ের অন্য দিক দেখা যায়। খাবার ছিল সহজ, উষ্ণ—ভাত-ডাল, রুটি, আর মৌসুমি তরকারি। মশ ঢাকা গাছের নিচে হাঁটতে হাঁটতে শুনলাম পাখির ডাক—টিট, ম্যাগপাই, লাফিং থ্রাশ, আর মাঝে মাঝে ফেজান্ট। এখানে ২০০-র বেশি পাখির প্রজাতি আছে। ‘জিরো পয়েন্ট’ থেকে পরিষ্কার দিনে দূরের দৃশ্য দেখা যায়। এক রাত বনভূমির গন্ধ আর পাখির সুরে কাটিয়ে আবার রওনা দিলাম।

নৈনিতাল পৌঁছালাম সবুজ বিনসর ছেড়ে। শহরের প্রাণ হলো ‘মল রোড’। নৈনি লেক শহরের কেন্দ্র—এর সময়সূচি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। সকালেই লেক সবচেয়ে শান্ত, আর নৌকা চলে সকাল থেকে সন্ধ্যা ছ’টা পর্যন্ত। তাই নৌকা ভ্রমণের পরিকল্পনা সকাল বা দুপুরে করুন। খাবারের জন্য স্যাকলির রেস্টুরেন্ট বিখ্যাত, আর মল রোডে অনেক ক্যাফে আছে—স্থানীয় থালি থেকে শুরু করে কফি আর আপেল পাই পর্যন্ত। আমরা ‘মাচান’ রেস্টুরেন্টে খেয়েছিলাম—চাইনিজ খাবার আর ভালো পরিষেবার জন্য পরিচিত। এক সকালে গেলাম জি. বি. পান্ত হাই অল্টিটিউড চিড়িয়াখানায়—ছোট কিন্তু হিমালয়ের প্রাণীদের সংরক্ষণে উৎসাহী। এরপর ঘুরলাম সাতটি ‘তাল’—সবচেয়ে বড় সাততাল, ওক আর পাইন গাছে ঘেরা; নয়টি কোণবিশিষ্ট নৌকুচিয়াতাল; দ্বীপসহ ভীমতাল; আর ছোট ছোট তাল—নাল, খুরপাতাল, পাশুপতি, নন্দ। নৈনিতাল থেকে ঘোরার অনেক জায়গা আছে—হনুমান গড়ি, স্নোভিউ পয়েন্ট, বা নৈনি লেকের উত্তর প্রান্তে থাকা নৈনা দেবী মন্দির।

শেষ সন্ধ্যায়, বৃষ্টি লেকের উপর টুপটাপ শব্দ করছিল। মুখে তখনো বাল-মিঠাইয়ের স্বাদ। আমরা নৈনিতাল ছাড়লাম সন্ধ্যায়, যখন লেকের রূপ সোনালি। কলকাতায় ফিরে বুঝলাম, কুমায়নের প্রতিটি জায়গা যেন একটা সুরের অংশ। এখন, যাত্রা শেষ হয়ে যাওয়ার পর, পুরো ছবিটা দেখতে পাচ্ছি—পাহাড়ের রেখা, গ্রামের গন্ধ, আর কুমায়নের জীবন্ত মানচিত্র, যা এখনো মনে বাজে।

✍️ লেখক: সৃজিত দাস, কলকাতা (যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ছাত্র)

Read this travelogue in English

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Developed By SanccyWebs