Latestবাংলারিভিউ

হেমন্ত বালার চিঠি (ডকুমেন্টারি) : ফিরে দেখা -রিভিউ সুদেষ্ণা সান্যাল

পরিচালক: অভিষেক গাঙ্গুলি, Cinema For A Cause ও জয়ন্তী সান্যাল এর যুগ্ম পরিবেশনায় নির্মিত

ডকুমেন্টারি নির্মাণে ব্যবহৃত পুরনো চিঠিপত্র, স্থাপত্য এবং সংগৃহীত ঐতিহাসিক নথির গভীরতা দর্শকের মনকে স্পর্শ করে। আর এখানেই হেমন্তবেলার চিঠি কেবল একটি তথ্যচিত্র রূপে সীমাবদ্ধ না থেকে হয়ে ওঠে সময়ের অনুভূতি, এক ধরনের শ্রবণচিত্র। এখানে ক্যামেরা দ্রুত সরে না, অপেক্ষা করে; আর চিঠি হয়ে ওঠে এক বিলম্বিত সংলাপ, যেখানে প্রেরক ও প্রাপক—দু’জনেই অনুপস্থিত। পরিচালক অভিষেক গাঙ্গুলি এই অনুপস্থিতিকেই চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্রে রূপ দেন।

এই সংবেদনশীল নির্মাণের পেছনে যাঁরা আছেন—বিশেষ করে জয়ন্তী সান্যাল(হেমন্তবালার দৈহিত্রী) —গবেষক ও আর্কাইভ সংগ্রাহকরা, ক্যামেরা ও শব্দ পরিকল্পনার নীরব শিল্পীরা,সম্পাদনার সংযত হাত(সৌম্যজিৎ দে, টিঙ্কু সরকার, সিদ্ধার্থ সেনগুপ্ত), রোহিণী বারিক ও অনুপ্রিয়া ব্যানার্জী মিশ্রর পরিণত অভিনয়, সংগীত ও আবহ নির্মাণের পরিমিত বোধ, রাগাশ্রয়ী আবহ সংগীত(অর্জুন রয়), রবীন্দ্র সংগীতের (শিল্পী: ইন্দ্রানী মুখার্জী বন্দ্যোপাধ্যায়) অনুভববেদ্য ব্যবহার; – সব মিলিয়ে ‘হেমন্তবেলার চিঠি ‘একক পরিচালকের কাজ হয়েও এক গভীর সমবায়ী স্মৃতি-চর্চা। 

স্ক্রিপ্ট গবেষক, চিত্রনাট্য রচয়িতা অরুন্ধতী চৌধুরীর অক্লান্ত প্রচেষ্টা, সাহায্য প্রদান, বিশেষ করে নির্মাণের সময় তাঁর সুরম্য আবাসটির ব্যবহার, পরম যত্নে গবেষণা ধর্মী দৃশ্য গুলির অনুষঙ্গরচনা, সে গুলিকে সময়োপযোগী করে তুলেছে|

জয়ন্তী সান্যাল, দেবাঞ্জনা সাধুখাঁ, Dr.পৃথা ঘোষ সেন, ফুল্লরা মুখোপাধ্যায়, শুভময় দে, রবীন্দ্র-গবেষক বিজন ঘোষাল এবং Dr.পবিত্র সরকার—আরো বহুস্বরের উপস্থিতিই ছবিটিকে একমাত্রিক না করে গভীর ও মনন ধর্মী করে তোলে। চিঠি, নথি ও প্রসঙ্গের নির্বাচন এখানে কেবল তথ্য জোগাড়ের কাজ নয়; এটি স্মৃতির প্রতি এক ধরনের নৈতিক দায়িত্ব পালন। এই মনোভাবের কারণেই আর্কাইভ এখানে প্রমাণ হয়ে ওঠে না, হয়ে ওঠে অনুভবের পরিসর।

ডকুমেন্টারিটি আবর্তিত হয় হেমন্তবালা দেবী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে। কিন্তু এখানে প্রেম কোনো রোম্যান্টিক পুনর্নির্মাণ নয়। এই প্রেম চিঠির ভাষায়, অপেক্ষার ভেতর, অসমাপ্ততার মধ্যে বাস করে। হেমন্তবালার প্রেম এখানে উচ্চারিত নয়—সংরক্ষিত। সমাজ, সময় ও নীরবতার চাপে যে ভালোবাসা প্রকাশের পূর্ণ ভাষা পায়নি;- সেই প্রেম, গভীর সখ্য, আত্ম নিবেদন ও তৎকালীন সমাজ চর্চা এই ছবির সবচেয়ে গভীর আবেদন| সংবাদ, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাএবং সাহিত্যসমালোচনার মেলবন্ধন একসঙ্গে স্মৃতির সেলুলয়েডে একটি ধারাবাহিকতা তৈরি করে, যা সহজেই মনের পর্দায় উদ্ভাসিত হয়।

 এই ডকুমেন্টারির সবচেয়ে বড় সাহস তার non-illustrative approach—এখানে অতীতকে দেখানো হয় না, শোনা হয়। আর্কাইভ এখানে প্রমাণ নয়, সংবেদন। চিঠিগুলি কখনোই sensational revelation হয়ে ওঠে না। বরং তারা মনে করিয়ে দেয়—ইতিহাস মানে সবকিছু বলা নয়; কিছু অসম্পূর্ণতা থেকে যাওয়াই শ্রেয়। এটি ডকুমেন্টারি এথিক্সের এক অত্যন্ত উচ্চ স্তরের উদাহরণ।

ভয়েস-ওভার কোনো authoritative কণ্ঠ নয়। এটি এমন একজন মানুষের কণ্ঠ, যিনি নিজেও নিশ্চিত নন—তিনি ঠিক কী পড়ছেন। কণ্ঠের এই দ্বিধা, থেমে যাওয়া, শ্বাস নেওয়ার জায়গাগুলো হেমন্তবেলার চিঠি-কে এক ধরনের quiet resistance cinema-তে রূপান্তরিত করে।

চিঠি মানেই তো এক সময় থেকে আরেক সময়ের দিকে যাত্রা। কিন্তু এই ছবিতে সময় এগোয় না—ঘুরতে থাকে। এখানে চিঠির যাত্রা থেমে যায়, কারণ প্রাপক নেই। রয়ে যায় শুধু প্রশ্ন। ফলে দর্শক আটকে পড়ে এক temporal limbo-তে—না পুরো অতীত, না পুরো বর্তমান।

এই ছবির সবচেয়ে মনে রাখার মতো উপাদানগুলির মধ্যে রয়েছে নীরবতা এবং ক্যামেরার সংযমী ব্যবহার। এই নীরবতা জানিয়ে দেয়—সব স্মৃতি প্রকাশের জন্য নয়, কিছু স্মৃতি শুধু বহন করার জন্য। এই cinematic restraint আজকের সময়ে অত্যন্ত বিরল।

হেমন্তবালা এখানে কোনো সংযোগসূত্র নন। তিনি এক নারী, যার কণ্ঠস্বর ইতিহাসে পূর্ণভাবে নথিবদ্ধ হয়নি। তাঁর প্রেমও তাই কোনো কৌতূহলের বস্তু নয়; এটি এক ধরনের নীরব অধিকার। এই ডকুমেন্টারি আমাদের প্রশ্ন করে—নারীর ব্যক্তিগত লেখা আমরা কেন কৌতূহল হিসেবে দেখি, ইতিহাস হিসেবে নয়?

পরিচালক অভিষেক গাঙ্গুলি নিজেকে সচেতনভাবে সরিয়ে রাখেন—চিঠির ওপর দাঁড়িয়ে কথা না বলে, চিঠির পাশে বসেন। এখানেই হেমন্তবেলার চিঠি হয়ে ওঠে এক ধরনের listening-driven cinema।

আজ, যখন ব্যক্তিগত লেখা সহজেই পাবলিক স্পেক্টাকলে পরিণত হয়, আর্কাইভ হয়ে ওঠে ডেটা আর স্মৃতি কনটেন্ট—হেমন্তবেলার চিঠি তখন এক ধরনের slow, ethical resistance শেখায়।

চিঠি পড়া মানে স্বত্বাধিকার পাওয়া নয় —অতীত কে চেনার দায় বহন করা|

ছবিটি শেষ হয় এক অদ্ভুত ব্যক্তিগত বিষণ্নতা ও প্রশ্নচিহ্ন রেখে—একটি অস্বস্তি, যা হয়তো স্মৃতিকে জীবিত রাখার একমাত্র পথ।

লেখিকা পরিচয়

আমি লিখি—লেখাই আমার ভাবনার ভাষা। প্রাইমারি স্কুলে পড়ানো আমার পেশা হলেও শিক্ষা আমার গভীর আগ্রহ ও নিরন্তর অনুসন্ধানের ক্ষেত্র। শ্রেণিকক্ষের ভেতর-বাইরে শিক্ষার নানা মাত্রা, শিশুদের ভাবনার জগৎ এবং সমাজের ছোট ছোট প্রান্তিক গল্প আমাকে ভাবতে শেখায়, লিখতে প্ররোচিত করে।

প্রাসঙ্গিক ও অপ্রাসঙ্গিক—এই দুইয়ের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে নানা বিষয় নিয়ে লিখতে ভালোবাসি। পড়া আমার নিত্যসঙ্গী; কবিতা লিখি, আঁকি—শিল্পের সঙ্গে সংলাপেই আমার আত্মপরিচয় ধীরে ধীরে নির্মিত হয়। শিল্পিত জীবনবোধকে ধারণ করেই আমি বেঁচে থাকার রসদ খুঁজি এবং শব্দের মাধ্যমে সেই যাপনকে ভাগ করে নিতে চাই পাঠকের সঙ্গে।

সুদেষ্ণা সান্যাল, কল্যাণী, মোবাইল -৮৩৩৪৮৭৮০৯৪, email – suchetana943@gmail.com ফেসবুক প্রোফাইল লিঙ্ক

রিভিউটি ইংলিশে পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Developed By SanccyWebs